রাখাইন সম্প্রদায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাখাইন সম্প্রদায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, জুলাই ০১, ২০২৬

রাখাইন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের ভূমিকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাদ্যপ্রশিক্ষণের অপরিহার্যতা

মং হ্লা প্রু পিন্টু

বাংলাদেশে রাখাইন শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষাদান ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন: অংশীজনদের ভূমিকা ও করণীয়

মং হ্লা প্রু পিন্টু

সোমবার, অক্টোবর ১০, ২০১১

'ওয়াগ্যোয়ে পোয়েহ্': রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রবারণা উৎসব

গামী ১২ অক্টোবর, বুধবার শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা (রাখাইন ভাষায় 'ওয়াগ্যোয়ে লাব্রে')। প্রবারণা পূর্ণিমা বা 'ওয়াগ্যোয়ে লাব্রে' উপলক্ষ্যে যে উৎসব হয় তাকে রাখাইনরা বলে 'ওয়াগ্যোয়ে পোয়েহ্'। এটি রাখাইনদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। 'ওয়া' শব্দের অর্থ হচ্ছে বর্ষাবাস আর 'গ্যোয়ে' বা 'ক্যোয়ে' শব্দের অর্থ পরিসমাপ্তি। অর্থাৎ 'ওয়াগ্যোয়ে'-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে 'ফুংগ্রী' বা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসব্যাপী বর্ষাব্রত পালনের পরিসমাপ্তি। আষাঢ়ি পূর্ণিমার ('ওয়াছো লাব্রে') পরদিন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসব্যাপী 'ওয়া' বা বর্ষাব্রত পালন শুরু হয়। আর প্রবারণা তথা আশ্বিনি পূর্ণিমার ('ওয়াগ্যোয়ে লাব্রে') দিন তা শেষ হয়।

এখানে উল্লেখ্য, বুদ্ধপূর্ণিমা তথা বৈশাখি পূর্ণিমার ('কাছুং লাব্রে') মতো আষাঢ়ি পূর্ণিমাও তথাগত বুদ্ধের ত্রিস্মৃতি বিজড়িত। আষাঢ়ি পূর্ণিমার দিনেই রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, ঊনত্রিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ এবং বুদ্ধত্ব লাভের পর ধর্মচক্র প্রবর্তন সংঘটিত হয়েছিল। এ জন্য প্রত্যেক বৌদ্ধের কাছে আষাঢ়ি পূর্ণিমা তিথিটি বিশেষ স্মরণীয়।

রাখাইনরা আজ থেকে 'ওয়াগ্যোয়ে পোয়েহ্' উদযাপন করছে। এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবটি সাধারণত পূর্ণিমা তিথি থেকে কৃষ্ঞপক্ষের চতুর্থী পর্যন্ত মোট পাঁচদিন (এলাকাবিশেষে তিনদিন) স্থায়ী হয়। উৎসবের প্রথম দিন (পূর্ণিমার দিন) রাখাইন তরুণ-তরুণীরা নতুন জামাকাপড় পরে 'কেয়াং' বা বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পুষ্পপূজা (বিশেষ করে শাপলা ফুল) করে থাকে। এই পুষ্পপূজা বা ফুল উৎসর্গ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয় পূর্ণিমার দিন খুব ভোরে। সেদিন ভগবান বুদ্ধকে উদ্দেশ্য করে (বুদ্ধমূর্তির সামনে) বিভিন্ন ধরনের পিঠা-পায়েসও উৎসর্গ করা হয়। এখানে উল্লেখ্য, পূর্ণিমার দিন খুব ভোরে রাখাইনদের ঘরে-ঘরে হরেক রকম পিঠা-পায়েস বানানো হয়। তৈরি করা পিঠার প্রথমাংশ অর্থাৎ অগ্রভাগ বুদ্ধের উদ্দেশে উৎসর্গ করার পর অবশিষ্টাংশ দিয়ে প্রতিবেশীদের আপ্যায়ন করা হয় কিংবা তাদের (প্রতিবেশীদের) ঘরে-ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পূর্ণিমার দিন সন্ধ্যা থেকে (এলাকাবিশেষে বিকাল থেকে) রাত অবধি 'ঔপোগো' (জল দেবতা)-এর উদ্দেশে বাঁশ ও রঙিন কাগজ দিয়ে তৈরি বৃহদাকার 'রিছিমিং'/'বগোহ্' (কল্পমন্দির) ভাসানো হয় নদী বা খালে। ওই কল্পমন্দিরে প্রতিঘাটে অপেক্ষমান নারী-পুরুষ সবাই মোমবাতি জ্বেলে জল দেবতাকে প্রণাম জ্ঞাপন করে। এ সময় কল্পমন্দির ভাসিয়ে নিয়ে আসা তরুণদল নৌকায় বসে গান-বাজনা করে। কল্পমন্দিরের সংখ্যা একাধিক হলে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলো 'ছেঙ্গ্যাই' (এক প্রকার স্লোগান, যা তরুণদল নেচে-নেচে গেয়ে থাকে)-এর মাধ্যমে স্বীয় পক্ষের কল্পমন্দিরের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে থাকে। এ সময় এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষকে ব্যঙ্গ করেও 'ছেঙ্গ্যাই' গাওয়া হয়। ইদানীং কল্পমন্দির ভাসানোর সময় সজীব গান-বাজনা বা 'ছেঙ্গ্যাই-এর পরিবর্তে রেকর্ড করা রাখাইন 'রোঃরা সাখ্রাং' বা লোকসংগীত মাইকে বাজাতে শোনা যায়। কল্পমন্দির ভাসানোর দৃশ্য উপভোগ করার জন্য রাখাইনদের পাশাপাশি ভিন্ন সম্প্রদায় এবং ধর্মের লোকেরাও কক্সবাজার জেলার রাখাইন অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় (বিশেষ করে চকরিয়ার হারবাং রাখাইন পাড়া, মহেশখালির গোরকঘাটা এবং রামু) ভিড় জমায়।

পাঠক, ইচ্ছা করলে আপনিও চলে আসতে পারেন চকরিয়ার হারবাঙে কিংবা রামুতে এবং দেখতে পারেন আজকের অনুষ্ঠান। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মী বন্ধুরাও রাখাইন সম্প্রদায়ের এই বর্ণাঢ্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান কাভার করতে পারেন উল্লিখিত স্পটে এসে কক্সবাজার পৌরবাসী রাখাইনরা কল্পমন্দির ভাসায় না। তারা প্যাগোডা বা চৈত্য-প্রাঙ্গণে বাঁশ ও রঙিন কাগজ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী মণ্ডপে বুদ্ধমূর্তি স্থাপন পূর্বক প্রদীপ পূজা বা বুদ্ধপূজা করে। এ সময় তরুণ-তরুণীরা (সাধারণত সাংগঠনিকভাবে) গৃহী পূজারিদের কোমল পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে।

প্রবারণা পূর্ণিমার রাতে বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে ফানুস বা আকাশ প্রদীপ (রাখাইন ভাষায় 'মিলুং' বা 'হ্মেয়িং') ওড়ানো হয়। রঙিন ফানুস বা আকাশ প্রদীপ ওড়ানোর অর্থ হচ্ছে ভাবী বুদ্ধ কুমার সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগের পর চুল কাটার ঘটনাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা। সেদিন রাতে বৌদ্ধ বিহার, সীমাঘর এবং চৈত্য বা প্যাগোডাগুলোয় মোমবাতি বা বিজলি বাতি জ্বেলে আলোকসজ্জা করা হয়।

'ওয়াগ্যোয়ে' উৎসবের অন্যান্য দিনে ধর্মীয় শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য হচ্ছে এলাকার বাভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পিণ্ড বা অর্ঘ্য দান করা। শোভাযাত্রার শেষে নিজেদের সমাজের 'কেয়াং' বা বৌদ্ধ বিহারে সমবেত হয়ে সবাই পঞ্চশীল গ্রহণ করে। প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে পরবর্তী পূর্ণিমা অর্থাৎ কার্তিকি পূর্ণিমা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রতিটি বৌদ্ধ গ্রামে 'কাথিং পোয়েহ্' (দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব) উদযাপিত হয়ে থাকে। এই 'ওয়াগ্যোয়ে পোয়েহ্'-র আবেদন রাখাইনদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে 'ওয়াগ্যোয়ে' একটি তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব।

[রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব 'ওয়াগ্যোয়ে পোয়েহ্' নিয়ে আমার লেখা একাধিক সচিত্র ফিচার ইতিপূর্বে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্য থেকে 'ভোরের কাগজ'-এ (৫ অক্টোবর ১৯৯৮, সোমবার) প্রকাশিত লেখাটি কিঞ্চিৎ (দিন-তারিখ) পরিবর্তন করে এখানে দিলাম।]

শুক্রবার, নভেম্বর ১৯, ২০১০

'মহা কাথিং পোয়েহ' তথা দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব


থাগত বুদ্ধের মতে এ জগতে সুখের চেয়ে দুঃখই বেশি। বৌদ্ধদর্শন মতে অবিদ্যাই দুঃখের মূল কারণ। অবিদ্যা বা অজ্ঞতা বলতে সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা বোঝায়। এই অজ্ঞতার কারণে পৃথিবীতে মানুষ বার-বার জন্মগ্রহণ করে এবং দুঃখ ভোগ করে। বৌদ্ধ ধর্ম মতে এটা মানুষের কৃতকর্মের ফল।

কর্মবাদ হল শর্তাধীন সৃষ্টিবাদের প্রকাশ। মহামতি বুদ্ধ বলেছেন, ভালো কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে পুণ্য বা 'পারমী' অর্জন করতে হবে এবং সমুদয় 'পারমী' অর্জিত হলেই নির্বাণলাভ সম্ভব। এ নির্বাণই হচ্ছে দুঃখ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় বা পথ। নির্বাণ কিন্তু মৃত্যু নয়, মৃত্যুতে দুঃখের নিবৃত্ত হয় না। দুঃখ থেকে মুক্তির জন্য নিরন্তরভাবে মানুষের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। 'পারমী' পূরণ বা অর্জন করা এ প্রচেষ্টারই অংশ। দশটি 'পারমী'র মধ্যে দান 'পারমী'ই শ্রেষ্ঠ।
বৌদ্ধ সাহিত্যে দানের একটি স্বরূপ আমরা লক্ষ করি 'ওয়েসেংদ্রা' জাতকে। গৌতম বুদ্ধত্ব লাভের আগে 'পারমী' পূরণ করতে-করতে পাঁচশো পঞ্চাশ (৫৫০) বার ইহজগতে জন্মগ্রহণ করেন বিভিন্ন প্রাণী রূপে। 'ওয়েসেংদ্রা' জাতক পর্যায়ে তিনি 'রাজা বেসন্তর' রূপে জন্মগ্রহণ করেন। দানশীল রাজা হিসাবে জীবনের সর্বস্ব দান করে রিক্তহস্তে বনবাসে যাওয়ার আগে তিনি প্রিয় দু'সন্তান 'গনা' ও 'জালী'কে 'যুজগা পুংন্নাহ' (যোজন ব্রাহ্মণ)-এর কাছে দান করেছিলেন। 'রাজা বেসন্তর' পরবর্তী জন্মে রাজপুত্র 'সিদ্ধার্থ গৌতম' রূপে জন্ম লাভ করেন এবং ঊনত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর পর্যন্ত টানা ছ'বছর কঠোর সাধনার পর বুদ্ধত্ব লাভ করেন।

কথিত আছে, তথাগত বুদ্ধ এক প্রবারণা পূর্ণিমার প্রক্কালে 'সাওয়েথি' (শ্রাবস্তী) তে অবস্থান করছিলেন। তখন মহৌপাসিকা 'ওয়িসাংখা' (বিশাখা) বুদ্ধের কাছে জানতে চান যে, পৃথিবীতে যতোরকমের দানকর্ম প্রচলিত আছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ দানকর্ম কোনটি। বুদ্ধ জানালেন, কঠিন চীবর দানই শ্রেষ্ঠ দান অর্থাৎ মহাদান। এই দানের মাধ্যমে একজন 'পারমী'পূর্ণ মহিলা পরজন্মে পুরুষ রূপে জন্ম লাভ করতে পারে। বুদ্ধের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে বিশাখা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা কেটে, রং করে, কাপড় বুনে এবং চীবর সেলাই করে ভিক্ষু সংঘকে দান করেছিলেন।
এ দিকে বাংলাদেশি বৌদ্ধদের কাছে কঠিন চীবর দানের পটভূমি সম্বন্ধে যে বিবরণ পাওয়া যায় তা এ রকম : তথাগত বুদ্ধ 'সাওয়েথি' (শ্রাবস্তী)-তে অবস্থানকালে ত্রিশজন পাবেয্যবাসী ভিক্ষু বর্ষাবাস শেষে বুদ্ধ দর্শনের জন্য সেখানে এসে পৌঁছান। বর্ষাবাসের তিনমাস একটানা ব্যবহারের ফলে ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র অর্থাৎ চীবর তখন একেবারে জীর্ণ হয়ে পড়ে। কথিত আছে, মহৌপাসিকা 'ওয়িসাংখা' (বিশাখা)-র জনৈক পরিচারিকা আহারের জন্য ওই ভিক্ষুদের আহ্বান করতে বিহারে গেলে তাঁদেরকে নগ্নগায়ে স্নানরত দেখতে পায়। বিষয়টি মহৌপাসিকা বিশাখাকে জানানো হলে তিনি স্বয়ং বুদ্ধের কাছে গিয়ে ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্রের শোচনীয় জীর্ণদশার কথা জানান। তখন বিশাখা বুদ্ধের উপদেশ অনুযায়ী এক অহোরাত্রির মধ্যেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে যথেষ্ট সংখ্যক চীবর প্রস্তুত করে ভিক্ষুদের দান করেন।

কঠিন চীবর দান করা হয় বছরে একবার। প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে পরবর্তী পূর্ণিমা অর্থাৎ কার্তিকি পূর্ণিমা (আগামী ২১ নভেম্বর ২০১০, রবিবার কার্তিকি পূর্ণিমা) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রতিটি বৌদ্ধ গ্রামে 'মহা কাথিং পোয়েহ' (দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব) উদযাপিত হয়ে থাকে। থেরবাদী বৌদ্ধদের কাছে কঠিন চীবর দানই সর্বোত্তম দান। প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে বুদ্ধ-শিষ্যা মহৌপাসিকা বিশাখা প্রবর্তিত এই দানোত্তম উৎসবকে উপমহাদেশের বৌদ্ধরা জাঁকজমকভাবে উদযাপন করে থাকে। এখানে উল্লেখ্য, যে বৌদ্ধ বিহারে বর্ষাব্রত পালন করা হয়নি সেই বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপিত হতে পারে না।

বুদ্ধের সময় ভিক্ষুরা শ্মশানে বা পথে-প্রান্তরে ফেলে দেওয়া পুরনো কাপড় সংগ্রহ ও সেলাই করে পরতেন। বর্তমানে ভিক্ষুরা বিশেষভাবে সেলাই করা গৌরিক বস্ত্র (চীবর) পরে থাকেন। ভিক্ষুরা এক সঙ্গে তিনটি মাত্র চীবর পরতে পারেন। চীবরগুলো হল : অন্তর্বাস বা পরিধেয় বস্ত্র, উত্তরাসঙ্গ বা বহির্বাস এবং সংঘাটি বা দোয়াজিক। রাখাইন ভাষায় এই তিনটি চীবরকে বলা হয় যথাক্রমে 'সাংবাইং', 'সাংঘেং' এবং 'ধূগউ' বা 'কোদাং'। এই তিনটি চীবরের যে-কোনো একটি বা একাধিক দ্বারা কঠিন চীবর দান করতে হয়। 'কঠিন চীবর' নামের তাৎপর্য হচ্ছে, চীবর তৈরি করা অর্থাৎ তুলা থেকে সুতা কাটা, কাপড় বোনা, নির্দিষ্ট নিয়মে কাপড় কেটে বিশেষভাবে সেলাই করা, রং করা ইত্যাদি কাজ চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ অরুণোদয় থেকে পরদিন অরুণোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই সমাপন করা। মোট কথা, কঠিন নিয়ম অনুসরণ করে চীবরটি প্রস্তুত করতে হয় বলে এর নাম 'কঠিন চীবর' ('কাথিং সাংঘেং')।

আমাদের দেশে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা সদরের রাজবাড়িস্থ রাজবন বিহারে বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে। রাঙামাটির রাজবন বিহার ছাড়া দেশের বৌদ্ধ অধ্যুষিত অন্যান্য এলাকায় সাধারণত পূর্বে প্রস্তুত চীবর দিয়ে কিংবা তৈরি করা চীবর কিনে কঠিন চীবর দান করা হয়ে থাকে। এই চীবরগুলো সাধারণত মিয়ানমার থেকে আসে।

বৃহস্পতিবার, মে ২৭, ২০১০

বুদ্ধ পূর্ণিমা ও রাখাইন সংস্কৃতি



জ (২৭ মে) শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমা তিথিটি বৌদ্ধদের পবিত্রতম তিথি। এ তিথিটি বৈশাখ মাসে না পড়লেও বৈশাখি পূর্ণিমা নামে খ্যাত। বৌদ্ধদের কাছে এটিই বুদ্ধ পূর্ণিমা। বুদ্ধ পূর্ণিমা মহামানব গৌতম বুদ্ধের ত্রিস্মৃতি বিজড়িত একটি পবিত্র দিন। বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতেই নিষ্পন্ন হয়েছিল ভাবী বুদ্ধ কুমার সিদ্ধার্থের মাতৃকুক্ষি হতে নিষ্ক্রমণ, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহা পরিনির্বাণ। খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দের বৈশাখি পূর্ণিমা তিথিতে লুম্বিনী কাননের শালতরুতলে কুমার সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। জন্মের পর বড়-বড় রাজজ্যোতিষীগণ রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্মপঞ্জিকা তৈরি করেন। পণ্ডিতগণ কুমার সিদ্ধার্থের মধ্যে মহাপুরুষোচিত বত্রিশটি সুলক্ষণ দেখতে পান। বৌদ্ধদের পবিত্রতম গ্রন্থ ত্রিপিটকে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। কুমার সিদ্ধার্থের জন্মের সাতদিন পর তাঁর গর্ভধারিনী মহামায়া বা মায়াদেবী অকষ্মাৎ দেহ ত্যাগ করেন। মায়ের মৃত্যুর পর সৎমা বা মাসি গৌতমীর (মহামায়া এবং গৌতমী পরস্পর সহোদরা, রাজা শুদ্ধোদন দু'জনকেই বিয়ে করেন) দ্বারা পালিত হন বলে কুমার সিদ্ধার্থের নাম হয় গৌতম। ঊনত্রিশ বছর বয়সে রাজকুমার গৌতম রাজসুখ ছেড়ে গৃহত্যাগী হন। দীর্ঘ ছ'বছর কঠোর সাধনার পর খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে আর এক বৈশাখি পূর্ণিমা তিথিতে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে উরুবেলার নৈরঞ্জণা নদীর তীরে বোধিদ্রুম বা অশ্বত্থবৃক্ষের তলে রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম 'বুদ্ধত্ব' লাভ করেন। মহামানব গৌতম বুদ্ধ আশি বছর বয়সে খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে আর এক বৈশাখি পূর্ণিমায় কুশীনগরের মল্লদের শালবনে পরিনির্বাণ লাভ করেন।

পরিনির্বাণের পর বুদ্ধের দেহাবশেষ দ্রোণ নামের এক ব্রাহ্মণ মগধের অজাতশত্রু, বৈশালির লিচ্ছবি, কপিলাবস্তুর শাক্য, অল্লকপ্প দেশের কোলিয়গণ, রামগ্রামের কোলিয়গণ, বেটদ্বীপের ব্রাহ্মণগণ এবং পাবার মল্লগণের মধ্যে ভাগ করে দেন। দ্রোণ ব্রাহ্মণ যে কুম্ভ দিয়ে বুদ্ধের দেহাবশেষ ভাগ করেন সেই পাত্রটি নিজে গ্রহণ করেন। অতঃপর পিপ্পলিবনের মৌর্যগণ ‌এসে কিছু না পেয়ে চিতা থেকে অঙ্গার সংগ্রহ করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে প্রিয়দর্শী মহামতি অশোক বুদ্ধের অস্থিধাতুসমূহ উদ্ধার করেন এবং সমগ্র ভারতবর্ষে স্তূপ নির্মাণ করে সংরক্ষণ করেন।

মহামানব বুদ্ধের পরিনির্বাণের বছর থেকে তাঁর নামে যে অব্দ গণনা করা হয় তা বুদ্ধাব্দ নামে পরিচিত। 'বুদ্ধ' শব্দের প্রকৃত আভিধানিক অর্থ জ্ঞানী। অন্যদিকে 'বুদ্ধ' নামটির তত্ত্বমূলক অর্থ হচ্ছে আলোকপ্রাপ্ত। বাস্তব সত্যের সন্ধান যিনি পেয়েছেন, যিনি সম্যক জ্ঞানের অধিকারী তিনিই বুদ্ধ। তাঁর আবিষ্কৃত সত্য বা মতবাদ অন্যদের তুলনায় ভিন্ন এবং বাস্তবধর্মী। তাই গৌতম বুদ্ধ যথার্থই বুদ্ধ। মহামানব বুদ্ধ যে সত্য ধর্ম প্রচার করে গেছেন তাতে কোনো ধরনের অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারের স্থান নেই। সেখানে দেব-দেবীর পূজা, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বা বিশ্বাসের স্থান নেই, আছে সর্বজন গ্রহণযোগ্য কতকগুলো নীতি, আদর্শ ও দর্শন। তিনি জ্ঞানীর শরণ, ন্যায়ের শরণ এবং একতার আশ্রয় গ্রহণের কথা বলেছেন। গৌতম বুদ্ধ একজন পরিপূর্ণ মানুষ, যিনি সমস্ত তৃষ্ণার বিনাশ সাধন করে সম্যক সম্বুদ্ধ রূপে জগতের সমস্ত জীবের মঙ্গলার্থে এবং দুঃখমুক্তির পথ দেখাতে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তথাগত বুদ্ধ 'দেব' বা 'অবতার' ছিলেন না। তিনি যথার্থই বুদ্ধ। তাঁর প্রবর্তিত ধর্মে মানুষে-মানুষে কোনো রকম বৈষম্য বা ভেদাভেদ নেই। বৌদ্ধ ধর্ম সুন্দর নীতিভিত্তিক এবং বিজ্ঞানসম্মত একটি ধর্ম।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিটি বৌদ্ধদের কাছে পবিত্রতম দিন। বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিকে বৌদ্ধরা সম্পূর্ণ ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে উদযাপন করে থাকে। তবে ভাষা, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিন্নতার কারণে পৃথিবীর ভিন্ন-ভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ সম্প্রদায় ভিন্ন-ভিন্ন আঙ্গিকে বা আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে এ পূর্ণিমা তিথিকে উদযাপন করে থাকে। রাখাইন সম্প্রদায়ও তাদের কৃষ্টি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী বুদ্ধ পূর্ণিমা (রাখাইন ভাষায় 'কাছুং লাহব্রে') তিথিকে উদযাপন করে থাকে। বুদ্ধ পূর্ণিমা বা 'কাছুং লাহব্রে' উপলক্ষ্যে যে উৎসব হয় তাকে রাখাইন ভাষায় 'ঞংরি লং পোয়ে' বলা হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতে বোধিদ্রুম বা অশ্বত্থবৃক্ষের গোড়ায় জল ঢালা হয় বলে রাখাইন ভাষায় এ রকম নামকরণ (অশ্বত্থবৃক্ষকে রাখাইন ভাষায় 'ঞং পাং' বা 'বঃথি পাং' বলা হয়)। সিদ্ধার্থ গৌতম দীর্ঘ ছ'বছর সাধনার পর বোধিবৃক্ষের তলায় বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন বলে প্রতিবছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন বিকাল বেলা বিহার আঙিনায় রোপণ করা বোধিবৃক্ষের গোড়ায় (প্রতি বছর একই গাছে) চন্দন মিশ্রিত জল ঢালা হয়। এর অর্থ হচ্ছে সিদ্ধার্থ গৌতমের বুদ্ধত্ব লাভকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা। বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে রাখাইন অধ্যুষিত কোনো-কোনো এলাকায় 'ওয়াংকাবাহ' (এক ধরনের চক্রব্যূহ) বসানো হয়। নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবাই ওই 'ওয়াংকাবাহ'-র অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রদক্ষিণে অংশগ্রহণ করে। বিকালে বৌদ্ধ বিহার থেকে ধর্মীয় শোভাযাত্রা বার করা হয় এবং গ্রাম প্রদক্ষিণের পর পুনরায় বৌদ্ধ বিহারে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রা শেষে নির্দিষ্ট বোধিবৃক্ষের গোড়ায় চন্দন মিশ্রিত জল ঢালা হয়। এর পর সমবেত প্রার্থনা এবং পঞ্চশীল গ্রহণ করা হয়। পঞ্চশীল গ্রহণের পর বয়োজ্যেষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষু ধর্মীয় আলোচনা করেন। 'ঞংরি লং পোয়ে' উপলক্ষ্যে সেদিন রাতে 'জ্যাঃ' (গীত-নৃত্য-অভিনয়ের ত্রিসঙ্গমজাত নাট্য) পরিবেশনের আয়োজন করা হয়। ইদানীং 'জ্যাঃ'-এর পরিবর্তে লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ('রোঃরা পোয়ে') এবং 'প্রাজ্যাঃ' (মঞ্চ নাটক) পরিবেশন করতে দেখা যায়। এ ছাড়া বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন বয়স্ক রাখাইন নারী-পুরুষ পূত-পবিত্র হয়ে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে উপোসথ বা অষ্টশীল পালন করে থাকেন।

ধর্মযুদ্ধে পৃথিবী বহুবার নররক্তে প্লাবিত হয়েছে। অথচ বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে ও প্রসারে কখনো পৃথিবী একবিন্দু নররক্তে কলঙ্কিত হয়নি এবং একবিন্দু পশুরক্তে পবিত্র বৌদ্ধ মন্দির অপবিত্র হয়নি। বর্তমান সময়ে শান্তিকামী মানুষের উচিত হবে, মহামানব গৌতম বুদ্ধের অহিংসা, মৈত্রী ও করুণার বাণী দিয়ে হিংসার উন্মত্ত বিশ্বে পরম শান্তি স্থাপন করা।